ভারতীয় দণ্ডবিধির ৪৯৮এ

১৯৮৩ সালে ভারতীয় দণ্ডবিধির ৪৯৮এ আইন প্রণিত হয় দেশে পণপ্রথা বিলোপ এবং বধূ নির্যাতন রোধের উদ্দেশ্যে । কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই অভিযোগ, এই আইনের অপব্যবহার হয়েছে। পুরুষ, দাম্পত্যে উত্পীড়িত পুরুষরা এইসব আইনকে ‘জেন্ডার বায়াস’-এ দূষিত বলে অনেকদিন আন্দোলন করছেন৷

তথ্য বলছে, ২০১৩ সালে পশ্চিমবঙ্গে ৪৯৮(এ) ধারার অধীনে ১৮,১১৬টি অভিযোগ নথিভুক্ত হয়েছে। সারা দেশের মধ্যে যা সর্বাধিক। সবচেয়ে বেশি মামলা দায়ের হয়েছে এই পশ্চিমবঙ্গেই। অথচ এ রাজ্যে অপরাধ প্রমাণিত হয়েছে মাত্র ২.৩%| এই মামলার সংখ্যায় পশ্চিমবঙ্গই প্রথম| পশ্চিমবঙ্গে এই মামলার সংখ্যা ১৮,১১৬ টি| এরপরই রয়েছে রাজস্থান, অন্ধ্রপ্রদেশের স্থান|

এ দেশে যতগুলি বধূ নির্যাতনের মামলা হয়, তার প্রায় চোদ্দো আনার ক্ষেত্রেই অভিযোগ কিচ্ছুটি প্রমাণ করা যায় না। বেশির ভাগটাই ভুয়ো! স্বামী আর শ্বশুরবাড়ির লোকজনকে অপদস্থ করার কৌশল মাত্র।

স্বাধীনতার ৬ দশক পরেও এ দেশের পুলিশ পরাধীন আমলের মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি। জনতার বন্ধু হওয়ার বদলে হেনস্থার অস্ত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে পুলিশ। আর গ্রেফতারির ঢালাও ক্ষমতা পুলিশে দুর্নীতির সম্ভাবনাও বাড়িয়ে তুলেছে। ৪৯৮এ-র অপব্যবহার পুলিশে দুর্নীতির সর্বশ্রেষ্ঠ দৃষ্টান্ত ।

৪৯৮এ আইনের বৈশিষ্ট্য হল-

১) এটি জামিন-অযোগ্য। মানে, থানা থেকে না, অভিযুক্তকে/দের হাজির করার পর আদালত থেকে জামিন পাওয়া যাবে;
২) এটি নন-কম্পাউন্ডেবল, অর্থাৎ এক বার অভিযোগ দায়ের করলে তা ফেরত নেওয়া যাবে না;
৩) এটি কগনিজেবল্, অর্থাৎ কিনা অভিযুক্তকে জেলে পুরতে হলে আদালতের নির্দেশ বা নিদেনপক্ষে কোনও প্রাথমিক তদন্ত কিংবা ওয়ারেন্টেরও ধার ধারতে হয় না পুলিশকে। স্রেফ তোলো, আর পোরো ।

প্রশ্ন হল এই আইনের অপব্যবহার হয় কেন ? অর্থই অনর্থের মুল । ‘নন বেলেব্ল’ আর ‘কগ্নিজেবল’-এর সাঁড়াশি আক্রমণকে অস্ত্র বানিয়ে সুপরিকল্পিত ভাবে ‘দু’দিনের শ্বশুরবাড়ি’ থেকে মোটা অঙ্ক হাতিয়ে নেওয়া মুল উদ্দেশ্য।

কোনও অবৈধ সম্পর্ক ফাঁস হয়ে গেলে পালটা চাপ সৃষ্টি, প্রাক্তন প্রেমিকের কাছে ফিরে যেতে ডিভোর্সের পথ সুগম করা, স্বামীকে তার বাপ-মা’কে ছেড়ে আলাদা সংসার পাততে বাধ্য করা, কিংবা বিবাহপূর্ব অসুস্থতা বা শিক্ষাগত যোগ্যতা সংক্রান্ত কোনও গোপন সত্য প্রকাশ হয়ে গেলে তার পালটা— এমন হরেক কারণই ৪৯৮এ অপব্যবহারের নেপথ্যে থাকে ।

৪৯৮এ অপব্যবহারে চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন বহু নির্দোষ স্বামী। মিথ্যে অভিযোগে তাঁর নিকটজনেরাও সমান ভাবে হেনস্থা হচ্ছেন। জেল খাটছেন, চাকরি খোয়াচ্ছেন, অপমানে ধ্বস্ত হচ্ছেন, কেউ বা এ জীবনটাই শেষ করে দিচ্ছেন। বৃদ্ধ, শিশু, এমনকী পরিবারের অন্য মহিলারাও পার পাচ্ছেন না। শুধু ২০১৩ সালেই ৪৭,৪৭১ জন মহিলা গ্রেফতার হয়েছেন এই আইনে।

প্রতি বছরই এ ধারার প্রয়োগে বাছবিচার না করেই স্বামী শ্বশুর ও বাড়ির মহিলাদেরও জেলে পোরা হচেছ৷ বহু বছর ধরে বিদেশবাসিনী ননদ বা শয্যাশায়ী দাদাশ্বশুর, দিদিশাশুড়িকেও গ্রেফতার করেছে পুলিশ এই ৪৯৮এ-র অভিযোগের ভিত্তিতে৷

৪৯৮এ ধারা যত না নির্যাতিতা বধূদের রক্ষা করতে ব্যবহৃত হয়, তার চেয়ে বেশি কাজে লাগে নিরীহ শ্বশুরবাড়িকে অপদস্থ করতে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ‘হু’ ঘোষণা করেছে, এ দেশে বয়স্কদের নিগ্রহের অন্যতম বড় কারণ ৪৯৮এ-র অপব্যবহার। মার্কিন প্রশাসন, কানাডা প্রশাসন আজ তাঁদের নাগরিকদের এই আইনের ‘ব্যথা’ মনে করিয়ে সতর্ক করছে, দু’বার ভেবে দেখতে বলছে, কোনও ভারতীয়ের সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ার আগে৷

গুচ্ছের ভুয়ো কেসের ঠেলায় আদালতের মূল্যবান সময় নষ্ট হচ্ছে, অহেতুক দীর্ঘায়িত হচ্ছে ৷

৪৯৮এ অপব্যবহার কারণে বহু মূল্যবান জীবন নষ্ট হয়েছে । কেন্দ্রীয় সরকারের রিপোর্ট অনুযায়ী প্রতি ন’মিনিটে একজন বিবাহিত পুরুষ আত্মহত্যা করছে।যার অন্যতম কারণ, স্বামী এবং শ্বশুরবাড়ির বিরুদ্ধে থানায় স্ত্রীর পণ-জনিত নির্যাতনের মিথ্যা নালিশ। ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ড ব্যুরোর (NCRB)পরিসংখ্যান বলছে, প্রতি বছর ৬৪হাজার বিবাহিত পুরুষ আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছে। এই তথ্য লজ্জাজনক তো বটেই যথেষ্ট উদ্বেগজনকও।

কোথাও স্বামী আত্মহত্যা করলেই সেটা কে সুন্দর ভাবে এড়িয়ে যায় সবাই অথচ স্ত্রীর স্বাভাবিক মৃত্যুকেও বধূ নির্যাতন তকমা দিয়ে জেলে পাঠনো হয় স্বামীকে|

কিছু উল্লেখযোগ্য ৪৯৮এ অপব্যবহার কারণে আত্মহত্যার উদাহরণ –

স্ত্রী মিথ্যা ৪৯৮এ করায় আত্মহত্যা করতে বাধ্য হন একজন তরুণ ডাক্তার শুভদীপ খান। স্ত্রী মিথ্যা ৪৯৮এ করায় অপমানে, লাঞ্ছনায় আত্মহত্যা পথ বেছে নিতে হয় ৩০ বছর বয়সী প্রতিভাবান ডাক্তার শুভদীপ।আসানসোলের কুলটি থানার এস.আই. তোজামেল মণ্ডল সহ স্ত্রীর বাড়ীর লোক টাকা আদায়ের জন্য শুভদীপের উপর চালায় অকথ্য।বেয়াইনি ভাবে গ্রেফতার করা হয়েছিল শুভদীপ সহ তার বাবা, মাকে।

আর একটা ঘটনায় ব্রজদুলাল পাল, স্ত্রী অনিতা ও পুত্র রজত-সহ চলন্ত ট্রেনের সামনে ঝাঁপ দিয়ে মারা গেলেন। কারণ এই যে, তাঁর পুত্রবধূ নিমতা থানায় ৪৯৮এ ধারায় স্বামী, শ্বশুর ও শাশুড়ির নামে পণের জন্য বধূ নির্যাতনের অভিযোগে মামলা দায়ের করেছিলেন।

১৯ জুলাই ২০১২ বেলা প্রায় এগারোটা। দমদম স্টেশন ছেড়ে এক নম্বর লাইন দিয়ে ছুটছিল আপ শান্তিপুর লোকাল। হঠাৎই চালক দেখতে পান, সাদা পায়জামা-পাঞ্জাবি পরা এক প্রৌঢ় এগিয়ে আসছেন লাইনের দিকে। তাঁর সঙ্গে রয়েছেন হলুদ সিল্কের শাড়ি পরা এক মহিলা এবং জিনস পরা এক যুবক। ট্রেন তখন প্রায় ৯০ কিলোমিটার বেগে চলছে। তিনি প্রাণপণে হর্ন বাজিয়ে সতর্ক করতে চেষ্টা করেন। কিন্তু, লাইন থেকে সরেননি ওই তিন জন।পলকের মধ্যে তাঁদের ধাক্কা মেরে কিছুটা এগিয়ে গিয়ে দাঁড়িয়ে যায় ট্রেন।

ছিন্নভিন্ন তিনটি দেহের পাশেই পড়েছিল প্লাস্টিকে মোড়া একটি সুইসাইড নোট। চিঠির বয়ান হল, ‘আমি ব্রজদুলাল পাল, আমার স্ত্রী অনিতা পাল এবং আমার ছেলে রজত পালের বিরুদ্ধে বধূ নির্যাতনের মিথ্যা মামলা করা হয়েছে। আমরা শেষ হয়ে গিয়েছি। বাড়ি থেকে পালিয়ে রয়েছি। এর পরেই পুলিশি খপ্পরে পড়ব। পুলিশের হাতে আরও নির্যাতিত হব। তা থেকে বাঁচতেই আমরা সবাই মিলে এই সংসার ছেড়ে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এ ছাড়া আমাদের আর কোনও উপায় ছিল না।’

বধূ নির্যাতনকে হাতিয়ার করে বা ফেমিনিজমের নামে যে মেয়েরা অকারণ পুরুষকে হেনস্থা করতে চাইছে, এই মুহূর্তে তাদের সংযত বা সতর্ক হওয়ার সময় এসেছে। এমনটা চলতে থাকলে অযথা হয়রানির আশঙ্কায় পুরুষরা আগামীদিনে বিয়ের মতো পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধনে জড়াতে অস্বীকার করতে পারে। ফলে মেয়েদের মধ্যে হতাশাও বাড়বে। অন্য দিকে, স্বামীর বিরুদ্ধে ওঠা পণের জন্য বধূ নির্যাতনের সত্যিকারের অভিযোগগুলিও হেয় বা খাটো প্রতিপন্ন হবে। অধিকাংশ নারী-পুরুষের মনে অবিশ্বাসের ছায়া ঘনাবে।

ভারতীয় দণ্ডবিধির ৪৯৮এ ধারায় বধূ নির্যাতনের অভিযোগ পাওয়া মাত্রই পুলিশ আর তড়িঘড়ি কোনও তদন্ত না করে এক কথায় অভিযুক্তকে গ্রেফতার করতে পারবে না। বুধবার এক রায়ে এই কথা জানিয়ে দিল সুপ্রিম কোর্ট।

বিহারের এক স্বামীর মামলার সূত্রে গত ২ জুলাই ২০১৪ সুপ্রিমকোর্ট রায় দিয়েছে, ‘no automatic arrest under 498A IPC dowry cases।’ সর্বোচ্চ আদালত পুলিশ এবং ম্যাজিস্ট্রেটদের নির্দেশ দিয়েছে, বধূ নির্যাতনের অভিযোগ পাওয়ামাত্র শ্বশুরবাড়ির লোকেদের গ্রেফতার করা যাবে না। গ্রেফতারের আগে অত্যাচারের সত্যতার প্রকৃত তদন্ত করতে হবে।অর্থাৎ, তথ্য-প্রমাণাদি ছাড়া স্বামী বা তার মা-বোনকে আটক করা যাবে না।৪৯৮এ ধারায় এই অভিযোগ আনা হলে তা জামিন-অযোগ্য এবং পরোয়ানা ছাড়াই সঙ্গে সঙ্গে অভিযুক্তকে গ্রেফতার করা যায়। কোর্টের বক্তব্য, সেই পরোয়ানা ছাড়া কাউকে গ্রেফতারের প্রয়োজন আছে কি না, এ ক্ষেত্রে আগে পুলিশকে তা খতিয়ে দেখতে হবে।

সংশ্লিষ্ট পুলিশ অফিসারকে ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে গ্রেফতারের যুক্তি ও তথ্যপ্রমাণ পেশ করতে হবে। ম্যাজিস্ট্রেটরাও যেন যান্ত্রিক ভাবে অভিযুক্তকে আটকে রাখার নির্দেশ না দেন। এর অন্যথা হলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বস্তুত, সাত বছর বা তার কম কারাদণ্ড হতে পারে, এমন যে কোনও অপরাধের অভিযোগ পেলে পুলিশ যাতে যথাযথ তদন্তের আগে গ্রেফতারের পথে না হাঁটে, সমস্ত রাজ্য সরকারকে তা নিশ্চিত করতে বলেছে সর্বোচ্চ আদালত। এই গোত্রের অপরাধগুলির মধ্যেই একটি হল বধূ নির্যাতন।

দুঃখের বিষয় ফৌজদারি দণ্ডবিধি সংশোধনে গ্রেফতারি নিয়ে যে স্পষ্ট নির্দেশ আছে, পশ্চিম-বাংলায় তা না মেনে, অভিযোগের তদন্ত না করে, এখনো ঢালাও গ্রেফতার বা আটক চলছে ।

পশ্চিম-বাংলায় দিন দিন পুরুষ নিরযাতন বেড়েই চলেছে।

Advertisements

About Amartya Talukdar

About: AMARTYA TALUKDAR was born in Kolkata, India. He has done his Masters in Mechanical Engineering from Indian Institute of Technology Benaras Hindu University. He is an avid blogger, computer geek , humanist , rationalist .
This entry was posted in বাংলা and tagged , . Bookmark the permalink.

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s